ধর্মীয় বিধান, সংবিধান ও ব্যভিচারের প্রচলিত শাস্তি!

আমাদের সংবাদ মাধ্যমগুলো অন্যের বিবাহিত স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে যেকোন অনৈতিক সম্পর্কেই  “পরকীয়া” বলে চালিয়ে দেয়। অনৈতিক সম্পর্কের অনেকসময় লোকজন তাদের চোখে অভিযুক্ত উভয়কেই আটক করে পুলিশে সোপর্দ করে। আবার একটি বিয়ে চলমান অবস্থায় আরেকটি বিয়ে পড়িয়ে দেয়ার ঘটনাও পুরাতন। অথচ, মানতে কষ্ট হলেও কোন পরকীয়াই অবৈধ নয় যতক্ষণ না সেটি ব্যভিচার পর্যন্ত গড়ায়। এবং ব্যভিচার হলেও সেটি আদালতের অনুমতি ব্যতীত পুলিস কর্তৃক আটক অযোগ্য। অপরদিকে  ‘পরকীয়া’  এবং  ‘ব্যভিচার’ এর মধ্যে পার্থক্য ব্যাপক। একজন বিবাহিত ব্যক্তির সাথে অপর একজন তৃতীয় ব্যক্তির প্রণয়ের সম্পর্ক গড়ে উঠলেই তা ব্যভিচার  বলা যায় না। বরং সেটি পরকীয়া। পরকীয়া যখন ব্যভিচারে পরিণত হবে অর্থাৎ সেক্সুয়াল ইন্টারকোর্স পর্যন্ত যায় তখনই সেটি অপরাধ হিসাবে গণ্যহয় প্রচলিত আইনে, অন্যতায় নয়।

আধুনিকতার সাথে তাল মিলিয়ে আমাদের অপরাধগুলোও হয়ে উঠেছে আধুনিক এবং সংজ্ঞাহীন। অপরদিকে, স্বাধীনতা পরবর্তীতে বৃটিশ থেকে আমদানিকৃত আইনগুলো উত্তম হলেও অনেকাংশে এবং বর্তমান সময়ের সাথে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রীয় সংবিধান ও ধর্মীয় মতার্দশের সাথে কখনো সাংঘর্ষিক, অপরীক্ষিত কখনো ঘুণেধরা বা অপর্যাপ্ত অথবা অকেজো।

ভার্চুয়ালের স্রোত, পশ্চিমা সংস্কৃতির আগ্রাসন, নাতিশীতোষ্ণের প্রভাব সবকিছুর ছোঁয়াতে বড় নৈতিক অবক্ষয় বিবাহবহির্ভূত অনৈতিক সম্পর্ক, ব্যভিচার। এই অবক্ষয়ে খুন হচ্ছে মায়ের হাতে সন্তান-স্বামী, ভাঙছে পরিবার, বিচারের টেবিলে বাড়ছে নথী।বাড়ছে মিথ্যে মামলার হয়রানি।

এই অবক্ষয়কে রোধ করতে প্রয়োজন আইনের যথার্থতা, প্রয়োগ, এবং ধর্মীয় ও নৈতিক সমৃদ্ধি। ব্যভিচারকে রোধ করতে বাংলাদেশে প্রচলিত আইনের বন্দোবস্ত রয়েছে ১৮৬০ সালের প্রণীত দণ্ডবিধির ৪৯৭ ধারায়। যেটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সংবিধান ও ধর্মিয় নীতির সাথে সাংঘর্ষিক মর্মে প্রতীয়মান।

ধারাটি বলছে, “যে ব্যক্তি, অন্যকোন লোকের স্ত্রী অথবা যাহাকে সে অপর কোন লোকের স্ত্রী বলিয়া  জানে বা তাহার অনুরুপ বিশ্বাস করিবার কারণ রহিয়াছে এমন কোন ব্যক্তির সহিত উক্ত অপর লোকের সম্মতি বা সমর্থন ব্যতিরেকে এইরুপ যৌনসংগম করে যাহা নারী ধর্ষণের সামিল নহে,  সেই ব্যক্তি ব্যভিচারের অপরাধে দোষী এবং যেকোন বর্ণনার কারাদণ্ডে —-যাহার মেয়াদ পাঁচ বৎসর পর্যন্ত হইতে পারে বা অর্থদণ্ডে বা উভয়বিধ দণ্ডে দণ্ডনীয় হইবে। অনুরূপ ক্ষেত্রে স্ত্রীলোকটি দুষ্কর্মের সহায়তাকারিণী হিসাবে দণ্ডনীয় হইবে না।”

ব্যাখ্যায় উঠে আসে অভিযোগ প্রমাণের ক্ষেত্রে প্রমাণিতব্য বিষয়ও, 
১) আসামী কোন নারীর সহিত যৌন-সঙ্গম করিয়াছিল।
২) উক্ত নারী বিবাহিতা ছিল
৩) নারীটির বিবাহ সম্পর্কে আসামী জানিত বা বিবাহ বিশ্বাস করিবার যথেষ্ট কারণ ছিল।
৪) ঐ সঙ্গম উক্ত নারীর স্বামীর সম্মতি বা (নীরব) সমর্থক ব্যতিরেকে হইয়াছিল।
৫) ঐরূপে অনুষ্ঠিত যৌনসঙ্গম নারী ধর্ষণের সামিল ছিল না।

হাস্যকর বিষয় যে এই ধারায় নারীকে কোন দোষ দেয়া হয়নি।
অথচ, পবিত্র কোরানে তৎদ্রুপ ব্যভিচারের জন্য নারী এবং পুরুষ উভয়কেই দোষারোপ করা হয়েছে সূরা -নুর, আয়াত ২’তে এবং শাস্তিও রাখা হয়েছে উভইয়ের জন্য।

দণ্ডবিধির ৫৩ ধারার শাস্তির উন্নত, নমনীয় ও পরিশোধনমূলক ধরণ এখানে ব্যবহার হলেও একতরফাভাবে শুধুমাত্র ছেলেকে দোষারোপ করা নারীটিকে ‘পুরুষের শিকার’ দেখিয়ে অব্যাহতি দেয়া উক্ত আয়াতের পরিপন্থী।

অপরদিকে, দেশের সকল আইনের নিয়ন্ত্রক রাষ্ট্রীয় সংবিধান। এবং এই সংবিধানের উদ্দেশ্য পূরণকল্পেই অন্যান্য আইনের সৃষ্টি। যার উল্লেখে অনুচ্ছেদ ৭ (২) স্পষ্ট করা আছে যে,  

“জনগণের অভিপ্রায়ের পরম অভিব্যক্তিরূপে এই সংবিধান প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ আইন এবং অন্যকোন আইন যদি এই সংবিধানের সহিত অসামঞ্জস্য হয়, তাহা হইলে সেই আইনের যতখানি অসামঞ্জস্যপূর্ণ, ততখানি বাতিল হইবে। “

এবং মৌলিক অধিকার বিভাগ অনুচ্ছেদ ২৬’শে নির্দেশ রয়েছে “(১) এই ভাগের বিধানাবলীর সহিত অসমঞ্জস্য সকল প্রচলিত আইন যতখানি অসামঞ্জস্যপূর্ণ, এই সংবিধান-প্রবর্তন হইতে সেই সকল আইনের ততখানি বাতিল হইয়া যাইবে। 

সুতরাং দণ্ডবিধির ৪৯৭ ধারাটি সংবিধানের সাথেও সাংঘর্ষিক এই কারণে যে অনুচ্ছেদ ২৭’শে বলা হয়েছে”    সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী।”

এবং অনুচ্ছেদ ২৮(২)-এ স্বীকার করা হয়েছে “রাষ্ট্র ও গণজীবনের সর্বস্তরে নারীপুরুষের সমান অধিকার লাভ করিবেন।”

সংবিধানে অধিকারের সমতা ও নারীপুরুষের বৈষম্যহীনতার স্পষ্ট নির্দেশনা থাকলেও আলোচিত ৪৯৭ ধারায় তার উল্টো। যেটি অসাংবিধানিক, বাতিলযোগ্য।

স্বাধীনতার পরবর্তীতে ২২মে ১৯৭২ সালের রাষ্ট্রপতির ৪৮নং অধ্যাদেশ দ্বারা বৃটিশসৃষ্ট পাকিস্তানের আইনগুলো বাংলাদেশে আমদানি করা হলেও আমদানিকৃত আইনগুলোর সাংবিধানিক শুদ্ধতা ও গ্রহণযোগ্যতা পরীক্ষা করা হয়নি। ফলে আইনগুলোর অনেক অংশই এখনো অসাংবিধানিক। যার খেসারত গুণতে হয় দণ্ডবিধির ৪৯৭ ধারায় ডা. মোস্তফা মোরশেদ আকাশের মত হাজারো আকাশকে।

তবে, আশার বাণী হচ্ছে গত ১১ই ফেব্রুয়ারি এডভোকেট ইশরাত হাসান চৌধুরী মহামান্য হাইকোর্টের নজরে এনেছেন বিষয়টি, ৪৯৭ ধারাকে চ্যালেঞ্জ করে টুকেছেন রিট। যদিও ২০১৮ সালেই ভারতের সুপ্রিম কোর্টও ধারাটিকে অসাংবিধানিক বলে মন্তব্য করেছেন। অবশেষে সংশোধিত হোক ৪৯৭ ধারা। আর কোন আকাশ আকাশে হারিয়ে না যাক।

লেখক- সভাপতি, বঙ্গবন্ধু আইন ছাত্র পরিষদ (চট্টগ্রাম উত্তর জেলা শাখা)

Add a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *