একটি ব্যর্থ রাষ্ট্র এবং নাগরিক দায়বদ্ধতা থেকে বলছি

সকাল ৫:৪৫ মিনিটে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজের ইমার্জেন্সি ইউনিটে ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধার অ্যাম্বুলেন্স প্রবেশ করে। রাত জাগা আমি পুরো রাত ধরে অ্যাম্বুলেন্স এবং সিএনজিতে একের পর এক রুগির আগমন পর্যবেক্ষণ করি। কিন্তু ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধার অ্যাম্বুলেন্স দেখে বেশ কৌতূহলী হয়ে পরিস্থিতির পর্যবেক্ষণ করি।

ondhokar
ব্যর্থ রাষ্ট্র

অ্যাম্বুলেন্স থেকে প্রথমজনকে হাতে ধরে দাঁড় করিয়ে নামিয়ে ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে নিয়ে যাওয়া হল। দ্বিতীয় জনকে বের করতেই আমি হতচকিত হলাম। সমস্ত মুখমন্ডল এবং মাথা থেঁতলে যাওয়া আহত ব্যক্তিকে স্ট্রেচারে করে উপরে আনা হল। কৌতূহলী হয়ে আমি ফায়ারসার্ভিসের কাছে ঘটনার বিবরণ শুনতে এবং ধন্যবাদ দিতে যাই। ফায়ার সার্ভিসের কর্মী জানালেন এই দুজন লরী দূর্ঘটনায় আহত হয়েছে। তাদের দায়িত্ব ছিল হাসপাতাল পর্যন্ত পৌঁছিয়ে দেয়া তারা সেটি করেছেন। দেখলাম ফায়ারসার্ভিসের অপর কর্মী হাসপাতাল রেজিস্টারকে রোগি বুঝিয়ে দিয়ে ডায়েরী নোট করে চলে গেলেন।আমি ইমাজেন্সি ট্রিটমেন্ট সেন্টারে প্রবেশ করে দেখি কর্তব্যরত শিক্ষানবিশ ডাক্তার ঔষধ লিখে দাঁড়িয়ে আছেন। আর ৫/৬ জন উৎসুক জনতা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আহতদের রক্তক্ষরণ দেখছেন। ডাক্তার আমার ব্যাকুলতা দেখে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন আমি রোগির কেউ কিনা। আমি তৎক্ষণাৎ বললাম আমি রোগির কেউ নই। তবে আমি রোগির চিকিৎসার ব্যাপারে সহযোগিতা করতে এসেছি। আমি ডাক্তারকে বললাম উনার মাথা থেতলে গেছে প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়েছে উনার ব্লাড টেস্ট করান। আমি ব্ল্যাড টেস্টের জন্য ব্ল্যাডব্যাংকে ব্ল্যাড নিয়ে যেতে প্রস্তুত। ডাক্তার আমাকে বললেন ব্ল্যাড টেস্ট করার আগে রোগির এই ঔষধ, ইঞ্জেকশন এবং স্যালাইন জরুরি। নাহয় রোগি বাঁচানো যাবেনা। লিস্ট নিয়ে ডাক্তারকে বললাম এসবের টাকা লাগবে। হাসপাতাল থেকে কোনো ব্যবস্থা আছে কিনা? তিনি জানালেন এমন কোনো সুযোগ নেই। আমি দ্রুত ফার্মেসীতে গিয়ে নিজ খরচে ঔষধগুলো সংগ্রহ করে আনি। স্যালাইন দেয়ার পর গুরুতর আহত রোগিকে তার পরিবার এবং গাড়ির মালিকের ফোন নম্বর, ঠিকানা জিজ্ঞেস করি। থেতলে যাওয়া মাথা নিয়ে তার গোঁগ্রানো ছাড়া কিছুই শুনতে পাইনি। ওদিক দিয়ে প্রচুর রক্তক্ষরণ হচ্ছে। তিনি যন্ত্রণায় লাফাতে লাগলেন। আমি, কর্তব্যরত ডাক্তার এবং সহকারী মিলে রক্তভেজা শরীর সামলে রাখি। কিছুটা কম আহত লরীর হেল্পারকে তার পরিবার এবং মালিকের ফোন নম্বর জিজ্ঞেস করি। সেও যন্ত্রণায় কাতরাতে ছিল। কিন্তু কোনো তথ্য দিতে পারেনি। কর্তব্যরত ডাক্তার গুরুতর আহত রোগিকে অর্থাৎ লরীর ড্রাইভারকে ঢাকা মেডিকেল কলেজের আইসিইউ রেফার করে। আমি যখন বললাম তাকে ঢাকায় নেয়ার সব খরচ আমি দিবো, প্লিজ আপনারা কেউ সাহায্য করুন। তখন অ্যাম্বুলেন্স চালক কাদির ভাই বললেন, আপনার সাথে আমি আছি। তবে ঢাকায় নেয়ার আগে রোগীদের পরিবার এবং মালিকের সাথে যোগাযোগ জরুরি। না হয় রোগি গাড়িতে মারা গেলে দায়ভার আপনাকে আর আমাকে নিতে হবে। কাদির ভাই আরো বললেন রোগিদের তথ্য সংগ্রহের জন্য চলুন ঘটনাস্থলে যাই। হেল্পারকে অ্যাম্বুলেন্সে তুলে ঘটনাস্থলের সন্ধানে আমাকে নিয়ে কাদির ভাই বের হয়ে পড়েন। হেল্পারকে বারবার জিজ্ঞেস করা স্বত্ত্বেও দুর্ঘটনা স্থলের সঠিক অবস্থান বলতে পারছেন না। 
অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে রাস্তায় চলতে চলতে আমরা খুঁজে পাচ্ছিলামনা। তখন আমার ফোন থেকে কুমিল্লা ফায়ারসার্ভিসকে কল দেই। তাদের জিজ্ঞেস করি দুর্ঘটনার সঠিক অবস্থান কোথায়? তারা জিজ্ঞেস করলেন কোন দুর্ঘটনা? আমি বললাম, দয়াপাড়া সুয়াগাজীতে আজ সকালে যে দুর্ঘটনা হয়েছিল, ফায়ারসার্ভিস আহতদের হাসপাতাল পৌঁছিয়ে দিয়েছিল। তখন তিনি জানালেন সেটি কুমিল্লা সদর দক্ষিণের ইউনিটের কার্যএলাকা। তিনি তাদের ফোন নম্বর দিলেন। সদর দক্ষিণ ইউনিটকে কল দিতেই একগাদা প্রশ্ন পাল্টা প্রশ্ন। আমি আমার পরিচয়ে বললাম হাসপাতালে আমার রোগি ছিল। দুর্ঘটনায় আহতদের অবস্থা দেখে আমি স্বেচ্ছায় অনুসন্ধান করছি। তখন তিনি আবার বললেন আপনি মালিক পক্ষের কেউ কিনা। অতঃপর তিনি সঠিক ঠিকানা জানালেন। ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখি বিশাল লরী দুমড়ে-মুচড়ে পড়ে আছি। স্থানীয় ২ কিশোরকে দেখে অনেক অনুরোধ করে গাড়ির ভেতরে ঢুকালাম কোনো মানিব্যাগ, ফোন নম্বর কিংবা মোবাইল ফোন পাওয়া যায় কিনা। সাহসী ভাইগুলো রক্তাক্ত দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া ড্রাইভিং সীট তন্নতন্ন করে খুঁজে শুধু লরীর শিপিং কোম্পানির চলান পেয়েছেন। আমি চালান কপি হাতে নিয়ে ফোন নম্বরে কল দিয়ে বিস্তারিত বলতে চাইলে অফিস থেকে কল কেটে দেয়া হয়। ৪/৫ বার এমন হওয়ার পর আমি এবং কাদির ভাই হাসপাতালে ফিরে আসি। কাদির ভাইয়ের সাথে পরামর্শ করে জাতীয় জরুরী নম্বর ৯৯৯ এ কল দিয়ে পুরো ঘটনার বর্ণনা দেই। পুলিশ থেকে শিপিং কোম্পানির ফোন নম্বর চাওয়া হলে সেটি সরবরাহ করি। পুলিশ আমাকে সর্বোচ্চ সহযোগিতার আশ্বাস দেন। ৩০ মিনিট পর ৯৯৯ এর ফিরতি কলে জানানো হয় তাদের কলও রিসিভ করছেনা “ইস্পাহানী সামিট অ্যালায়েন্স টার্মিনালস লিমিটেড”। তখন আমাকে বলা হয় আমার অবস্থান জানানোর। আমি জানাই আমি কুমিল্লা কোতোয়ালি থানায় আছি। তখন আমাকে কোতোয়ালি থানার নম্বর দেয়া হয়। ডিউটি অফিসারকে কল দিতেই উনি জিজ্ঞেস করলেন দুর্ঘটনা ঘটেছে কোথায়? আমি বললাম সুয়াগাজীতে। তখন তিনি বললেন এটা সদর দক্ষিণের অন্তর্গত। আপনি সদর দক্ষিণে যোগাযোগ করুন। আমি জানালাম ৯৯৯ থেকে তার সাথে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে। তিনি বললেন আপনি আবার ৯৯৯ এ কল দিন। আমি আবার ৯৯৯ কল দিয়ে পুলিশ প্রতিনিধির সাথে কথা বলি। তিনি বিস্তারিত শুনে বললেন আপনি যেহেতু রোগির কেউ না, সাধারণ নাগরিক হিসেবে আপনি আপনার দায়িত্ব পালন করেছেন। আপনি এখন আপনার বাসায় চলে যান। বাকিটা পুলিশ দেখবে। সারা রাত জাগা আমি আর দাঁড়াতে পারছিলাম না। কাদের ভাইকে চালানপত্র বুঝিয়ে দিয়ে আমি বাসায় চলে আসলাম। সর্বশেষ খবর পর্যন্ত আহতদের কোনো ট্রিটমেন্ট হয়নি। পুলিশও কোনো ভূমিকা পালন করেনি। একা লাড়াই করা আমি এবং কাদের ভাইকে হেরে যেতে হচ্ছে। রোগির যে পরিমাণ রক্তক্ষরণ হয়েছে এবং মাথা থেতলে গেছে তাকে আর বড়জোরে এই অবস্থায় ৪/৫ ঘন্টা রাখা যাবে। 
একটা স্বাধীন রাষ্ট্রে কেন এমন হবে?
আমাদের এতো সমৃদ্ধির দেশে কেন একজন সাগরকে এভাবে মরতে হবে?
কেন রাষ্ট্র অভিভাবকহীনদের চিকিৎসার খরচ বহন করে না? স্বাধীনতার ৪৮ বছরেও কেন আমাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা এতো দুর্বল??

Osman Gani Shahed

Add a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *