আমার পৃথিবীতে আসলে কেউ ছিল না

“আমার পৃথিবীতে আসলে কেউ ছিল না … কোন বন্ধু না … ভাই বোন কেউ না … শুধু ‘ও’ ছিল … পুরো পৃথিবী উপেক্ষা করে আমি ওর কাছে ছুটে আসতাম … আমার কাছে আমার পৃথিবী ছিল ও-ই !!

শেষ বিকেলে যখন তীব্র মাথা ব্যথায় চোখের সামনের সবকিছু অন্ধকার হয়ে আসতো, আমি ওকে ডাকতাম … টিএসসির সস্তা টং দোকানের কড়া লিকারের চা কিংবা ক্রিমসন কাপের ধোঁয়া ওঠা কফির প্রতিটা চুমুকে ও পাশে ছিল !!

পরীক্ষার হলে সাদা খাতা জমা দিয়ে যখন ঝিম মেরে বসে থাকতাম, জীবন নিয়ে তীব্র হতাশায় ডুবে যখন মরে যেতে ইচ্ছে হতো, মাঝরাতে ঘুম ভেঙ্গে গেলো যখন আশেপাশে হাতড়ে কাউকে খুঁজে না পেয়ে প্রচণ্ড একা লাগতো – সবসময় ও ছিল … কোন না কোনভাবে আমি ওকে পেতাম !!

আমি এর আগে কখনোই প্রেমে পড়ি নি … ও আমাকে বলতো, আমার ভেতরে নাকি কোন হৃদপিন্ড নেই … আমি শুধু ফুসফুস দিয়ে নিঃশ্বাস নিয়ে বাঁচি … নিজের অজান্তেই ও আমার ভেতরে একটা চারাগাছের মত একটু একটু করে খুব যত্ন করে একটা হৃদপিন্ড তৈরি করতে লাগলো … সেই হৃদপিন্ডের প্রত্যেকটা স্পন্দন ও নিজে নিয়ন্ত্রণ করতো !!

আমার কাছে প্রেম মানে ছিল বিলাসিতা … এই মানুষটা কেমন করে যেন আমাকে বিলাসী বানিয়ে ফেলতে লাগলো !!

ও আমার জন্য নিরাপদ একটা আশ্রয় ছিল … মানসিক একটা আশ্রয় … আমার হতাশায় মুষড়ে পড়া শ্রান্ত ক্লান্ত অসহায় মনটাকে ও শব্দ দিয়ে যত্ন করে বানানো কথার কুঁড়েঘরে আশ্রয় দিতো … সেই কুঁড়েঘরটা ছিল আমার মৃতপ্রায় মনের একমাত্র হাসপাতাল … সেই হাসপাতালের একমাত্র ডাক্তার ছিল ও … অমন ডাক্তার গোটা পৃথিবীতে আর নেই !!

গোটা বিশ্ব জয় করে ফেলার মত সাহস ছিল আমার ভেতর … মাঝরাতে পথ হারিয়ে হাইওয়েতে কুয়াশার মাঝে হাঁটতে আমার বুক কাঁপতো না … সাঁতার না জেনেও পানিতে নেমে যেবার ডুবে যেতে নিলাম, দম আটকে আসার সময়টাতে কষ্ট হচ্ছিলো, ভয় হয় নি !!

আমার একটাই ভয় ছিল … একটাই ভয় … ওকে হারিয়ে ফেলার ভয়

হারিয়ে ফেলার ভয়ে আমি কখনো টু-শব্দ করি নি … আমার বুকের ভেতরে ‘ভালোবাসি’ কথাটা সহস্রবার বিদ্রোহ করে গলা পর্যন্ত এসে ভয়ের ব্যারিকেডে আটকে গেছে, সামনে এগোতে পারে নি !!

আমার অবাধ্য আঙ্গুলগুলো থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে ওর কপালের এলোমেলো চুল সরিয়ে দেয়ার ইচ্ছেকে খুন করে মরে গেছে কয়েক লক্ষবার !!

আমার টলমল করতে থাকা চোখ ওর চোখের দিকে একরাশ মুগ্ধতা নিয়ে তাকিয়ে খুব গোপনে প্রেম লুকোতে শিখে ফেলেছিল !!

পৃথিবীর সবচেয়ে বোকা আর ভীতু মানুষ হয়ে ওর পাশটাতে হেঁটে গেছি, চোখে চোখ রেখেও দৃষ্টি সরিয়ে নিয়েছি … একদিন হারিয়ে যাবে জেনেও তখনই হারিয়ে ফেলার ভয়ে আমি ওর প্রেমে পড়ি নি !!

জীবনটা অদ্ভুত … এই জীবনে কারো জন্য বুকের ভেতর তীব্র রকমের প্রেম পুষে রেখেও তার প্রেমে পড়া যায় না … নিয়তির অলিখিত নিয়মে এখানে কারো কারো প্রেমে পড়া একদম বারণ !!

“প্রেমে পড়া বারণ
কারণে অকারণ
ওই মায়া চোখে চোখ রাখলেও
ফিরে তাকানো বারণ।

শূন্যে ভাসি, রাত্রি এখনো গুনি,
তোমার আমার নৌকা বাওয়ার 
শব্দ এখনো শুনি।
তাই মুখ লুকিয়ে ঠোঁট ফুলিয়ে
বসন্তের এই স্মৃতিচারণ।

প্রেমে পড়া বারণ
কারণে অকারণ
মনে পড়লেও আজকে তোমায়
মনে করা বারণ।”

Mushfiqur Rahman Ashique

Add a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *